রোববার   ২৯ জানুয়ারি ২০২৩   মাঘ ১৬ ১৪২৯   ০৭ রজব ১৪৪৪

 ফরিদপুর প্রতিদিন
সর্বশেষ:
পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রীর মুখে বাংলাদেশের উন্নয়ন শেখ হাসিনা তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করছেন: শামীম ওসমান গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফাইনাল রাউন্ডে ব্রাজিল বিশ্বজুড়ে করোনায় মৃত্যু-শনাক্ত কমেছে
৩৯০

ফরিদপুরে খেজুরের গুড় তৈরিতে ব্যস্ত গাছিরা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭ ডিসেম্বর ২০২২  

গ্রামীণ অর্থনীতিতে খেজুরের গুড় বেশ ভূমিকা রাখছে । তাই তো রাজশাহী থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গাছি এসে ফরিদপুরে তৈরি করছে খেজুরের গুড়। ভেজালমুক্ত ও গুণে-মানে ঠিক থাকায় এই গুড়ের চাহিদা রয়েছে বেশ ।

গত কয়েক বছর ধরে শীত মৌসুমে কর্মহীন ওই গাছিরা দলবেঁধে আসেন ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলাতে। তারা এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কিংবা মালিকানা খেজুরের গাছ ভাড়া নিয়ে চার মাস ধরে গাছ থেকে রস নিয়ে তৈরি করে এই সুস্বাদু গুড়।

দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে খেজুরের রসে নিপা ভাইরাসের প্রার্দুভাবে কারণে গাছিরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় রস সংগ্রহ করেন এখানে।

ফরিদপুর জেলা পাট ও পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের পাশাপাশি খেজুরের গুড় তৈরির জন্যও বিখ্যাত। গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে রাসায়নিক কোন দ্রব্য ব্যবহার ছাড়াই গুড় তৈরি করে থাকেন এখানকার গাছিরা। সেকারণে এখানকার খেজুরের গুরের সুনাম রয়েছে সারাদেশে।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গুড় নিতে আসেন বিভিন্ন জেলার মানুষ। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পাঠানো হয় খেজুর গুড়। তবে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় ক্রেতাদের চাহিদামত গুড় দিতে পারেন না গাছিরা।

সরেজমিনে ফরিদপুর শহরতলীর গঙ্গাবর্দী এলাকার কৃষি ইনস্টিটিউট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। রস চুলায় জ্বাল দেওয়ার প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে লাল গুড় তৈরি হতে। রস জ্বালিয়ে তৈরি করা গুড়ের চাহিদাও অনেক। এসময় ৪-৫ জন ক্রেতাকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

খেজুরের গুড় নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত কাজ করছেন কৃষি কলেজ এলাকার বাসিন্দা এনামুল হাসান গিয়াস। তিনি বলেন, আগের চেয়ে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে। তাছাড়া গাছ কেটে রস বের করার জন্য গাছিও পাওয়া যায়না। রাজশাহী, যশোরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে গাছিদের আনতে হয়।

তিনি আরো বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থানের প্রায় ১ হাজার ৫শ গাছ দেখভাল করেন তিনি। নিপা ভাইরাসরোধে প্রতিটি গাছে রস সংগ্রহের সময় হাড়ির মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। এই গাছগুলো থেকে রস বের করার জন্য তিনি রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে গাছিদের নিয়ে আসেন। কোনো লাভের জন্য নয়, তিনি এই জেলার বিখ্যাত গুড় মানুষের দাড়প্রান্তে পৌঁছে দিতেই তিনি এ কাজটি করে থাকেন। বিভিন্ন জায়গার খেজুর গাছ গাছিদের বছর চুক্তিতে লিজ নিয়ে দেন তিনি।

এনামুল হাসান আরো বলেন, সারাদেশেই এই গুড়ের চাহিদা রয়েছে। দেশের বাইরেও গুড় পাঠানো হয়। তবে রসের জোগান না থাকায় গুড় দিতে হিমশিম খেতে হয়।

রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার দিঘা গ্রামের বাসিন্দা লালন আলী প্রামানিক। তিনি রাজশাহী থেকে নভেম্বর মাসের শুরুতে এসেছেন ফরিদপুরে। সাথে নিয়ে এসেছেন আরো তিনজন সহযোগীকে। লালন প্রামানিক বলেন, কৃষি কলেজ ও আশপাশের ১৫০টি খেজুর গাছ আমরা তিনজন দেখভাল করছি। নভেম্বর মাসের শুরুতে এসেছি। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বাড়িতে যাব।

তিনি আরো বলেন, প্রতিটি গাছ আমরা ৩শ টাকা করে এবছরের জন্য লিজ নিয়েছি। গাছ কাটার প্রথম এক মাস রস বের হয় না। পরের দুই মাস রস পাওয়া যায়। এখন মোটামুটি রস পাচ্ছি আমরা। রস বিক্রি করছি ৪০ টাকা লিটার, এছাড়া এক হাড়ি (৮ লিটার) নিচ্ছি ৩৫০ টাকা। আর ঝোলা গুড় বিক্রি করছি ৩শ টাকা, শক্ত পাটালি বিক্রি করছি ৪শ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি।

রাজশাহী থেকে আসা গাছি সেলিম মন্ডল বলেন, বাদুর যাতে রসের হাড়ির উপর বসতে বা মুখ দিতে না পারে সেজন্য নিল কাপড় দিয়ে হাড়ির মুখ বেঁধে দেওয়া হয়। নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিন ১৫০টি গাছের মধ্যে ৮০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। তাতে প্রতিদিন ২৫০ লিটার রস সংগ্রহ করতে পারি। এই রসে প্রতিদিন ১৫ কেজি গুড় তৈরি হয়।

তিনি আরো বলেন, সরাসরি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে কোনপ্রকার রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রন ছাড়াই এই গুড় তৈরি করা হয়। অনেকেই সামনে দাঁড়িয়ে থেকে গুড় তৈরি করে নিয়ে যান। যে পরিমাণ রস সংগ্রহ হয়, তাতে যে পরিমাণ গুড় তৈরি হয় তাতে চাহিদা পূরণ হয় না। অনেককেই আমরা গুড় দিতে পারি না।

আরেক গাছি আরশাদ শেখ বলেন, গাছে উঠা অনেক ঝুঁকির কাজ। অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। ফরিদপুরে এসেছি, এখানে চার মাস থাকব। এই চার মাস শেষে থাকা খাওয়া ও গুড় তৈরির জ্বালানি খরচ বাদে একেকজন ৭০-৮০ হাজার টাকা নিয়ে যেতে পারব। যদি রস ভালো বের হয়, তাহলে কিছুটা লাভ বেশি হতে পারে।

কৃষি কলেজ এলাকায় যেখানে গুড় তৈরি করা হয় সেখানে গুড় কিনতে আসা সদর উপজেলার কানাইপুর থেকে আসা রহিম শেখ ফরিদপুর প্রতিদিনকে বলেন, এখানে ভেজালমুক্ত গুড় পাওয়া যায় তাই কিনতে এসেছি। আগে দুই কেজি নিয়েছিলাম। ছেলে বিদেশে থাকে তার জন্য পাঠাব, একারণে তিন কেজি নিতে এসেছি। কিন্তু ওরা দিতে পারল না। বলল কয়েকদিন দেরি হবে। ৪শ টাকা কেজি দরে তিন কেজির দাম ১২শ টাকা দিয়ে গেলাম, পরে এসে নিয়ে যাব।

ফরিদপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ফরিদপুর প্রতিদিনকে বলেন, ফরিদপুরের খেজুর গুড়ের সুনাম রয়েছে সারাদেশে। তবে দিনদিন খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় গুড় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সম্প্রতি সময়ে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে গাছ লাগানো হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, বিশেষ করে এখানকার গাছিরা নিপা ভাইরাসরোধে গাছ থেকে রস সংগ্রহের সময় হাড়ির মাথায় কাপড় বেঁধে রাখে। এছাড়া গুড় তৈরির সময় কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। এ কারণে গুড়ের স্বাদও আলাদা হয়। ফরিদপুর জেলা পাট ও পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের পাশাপাশি খেজুরের গুড় তৈরির জন্যও বিখ্যাত। তাই এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কৃষি বিভাগ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

 ফরিদপুর প্রতিদিন
 ফরিদপুর প্রতিদিন
এই বিভাগের আরো খবর