শুক্রবার   ১৯ জুলাই ২০২৪   শ্রাবণ ৪ ১৪৩১   ১৩ মুহররম ১৪৪৬

 ফরিদপুর প্রতিদিন
১৭৮

স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিচ্ছে সরকার

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০২৪  

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিচ্ছে সরকার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবিলায় এই ঋণ দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ২০২৪ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে এডিবির ‘সাপোর্ট টু হেলথ কেয়ার ইমপ্রুভমেন্ট প্রোগ্রামের’অধীনে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। গত ১৪ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এডিবির পক্ষ থেকে ঋণ প্রদানে বেশকিছু শর্ত রয়েছে। এডিবির সব শর্ত মেনেই ঋণ গ্রহণে আগ্রহী বাংলাদেশ।

গুরুত্বপূর্ণ এই সভায় যারা ছিলেন, তারা কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ঋণের শর্তের মধ্যে কাজ শুরুর আগে অন্তত দুটি স্থানে পাইলটিং (পরীক্ষামূলক) করতে হবে। প্রাথিমকভাবে রংপুর ও খুলনাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তবে পাইলটিংয়ের ব্যয় বাংলাদেশ সরকারকেই বহন করতে হবে, যার পরিমাণ দুই মিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ২৩ কোটি টাকা।

প্রকল্পে যেসব খাতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে : ১. স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন; অসংক্রামক রোগ, ইনজুরি ও বয়সজনিত জটিলতা; স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও মহামারি নিয়ন্ত্রণ; মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধকতা। ২. স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়ন-পাঠ্যক্রমের মানোন্নয়ন ও উদ্ভাবনী বিদ্যা; অনুষদগুলোর ক্রমাগত উন্নয়ন; শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন; মূল্যায়ন স্বীকৃতি এবং পর্যবেক্ষণ। ৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য-মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা; ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও লিঙ্গবৈষম্য।

দেশের স্বাস্থ্যসেবায় যত প্রতিবন্ধকতা: এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৮৮ শতাংশ কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবার মান অতি নিম্ন। ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলো পুরোপুরি কর্মক্ষম নয়। স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ লোকবলের অভাব। চিকিৎসকের ঘাটতি এখনো ৩৫ শতাংশ, নার্স ও ধাত্রীর ঘাটতি ৮৬ শতাংশ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ১৪ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের ৩২ শতাংশ অনুমোদিত পদই শূন্য। এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় চরম ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষায় চরম ঘাটিত রয়েছে। এমনকি আইপিএইচ, নিপসম এবং আইইডিসিআর প্রতিষ্ঠানগুলো একই ধরনের কাজ পৃথকভাবে করে যাচ্ছে। এতে অধিক্রমণ বা ওভারলেপিং জটিলতার সৃষ্টি হয়।

যেসব প্রতিষ্ঠানের এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন হবে: তিন স্তরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় দেশের স্বাস্থ্যসেবা। প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে ১৩ হাজার ৯০৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ১ হাজার ৩৬২টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টার। দ্বিতীয় ধাপে আছে ৪২৪টি উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স এবং ৫৯টি জেলা ও জেনারেল হাসপাতাল। সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে ১৮টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ১১টি বিশেষায়িত হাসপাতাল।

৩৩ বছরের তুলনামূলক চিত্র: এডিবি বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গত ৩৩ বছরের তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করেছে। দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে দেশে গড় আয়ু ছিল ৫৮ দশমিক ৯ বছর। ২০২০ সালে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশিমক ৮ বছরে। ১৯৯০ সালে দেশে সন্তান উৎপাদনের হার ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২১ সালে সেটি ২ শতাংশে নেমে আসে। নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১৯৯০ সালে ছিল ৬৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে সেটি কমে ২৭ শতাংশে নেমেছে। এসব তথ্য এডিবি, বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের। প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার এই উন্নয়নকে ‘স্বল্প ব্যয়ে ভালো স্বাস্থ্যসেবা’ বলে উল্লেখ করেছে। কেননা জিডিপির ১ শতাংশের কম বিনিয়োগে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

বর্তমান চিত্র: এই সাফল্যের পরও বর্তমানে দেশের মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৫৬ জন। ১৯৯০ সালের তুলনায় অসংক্রামক রোগের হার বেড়েছে ৪০ শতাংশ। বর্তমানে মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ ঘটছে অসংক্রামক রোগে। পৃথিবীতে যক্ষ্মা সংক্রমিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বছরে তিন লাখের বেশি মানুষকে ডেঙ্গু সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। এ কারণে ১ হাজার ৭০০ জনের মৃত্যু হয় ২০২৩ সালে। ১৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১০ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবনধারণ করছে। বর্তমানে দেশে প্রতি ১০ জনে একজন মানুষ ষাটোর্ধ্ব। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা দ্বিগুণে পৌঁছাবে। এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসা পেতে ৭৪ শতাংশ ব্যয় করতে হয় পকেট থেকে।

যেখানে গুরুত্ব দিতে হবে: এডিবি মনে করে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে ক্রমবর্ধমান বয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ নিরসনে ভূমিকা নিতে হবে। মানসিক রোগ নিরাময়ে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দৃষ্টি নিবন্ধন করতে হবে।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ডা. ফয়জুল হাকিম বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতি বিদ্যমান। সেখানে এই ঋণ নিয়ে কতটা উন্নয়ন করা সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। এই ঋণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন না হলেও কিছু আমলার ব্যক্তিগত উন্নয়ন হবে। স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ঋণের প্রয়োজন নেই, সরকারের আন্তরিক দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট।

 ফরিদপুর প্রতিদিন
 ফরিদপুর প্রতিদিন
এই বিভাগের আরো খবর