সোমবার   ০৪ জুলাই ২০২২   আষাঢ় ২০ ১৪২৯   ০৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

 ফরিদপুর প্রতিদিন
সর্বশেষ:
ফরিদপুরে স্কুল মাঠে পশুর হাট বন্ধ করলেন ইউএনও প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে হবে তরল জ্বালানি ঈদুল আযহা উপলক্ষে এক লক্ষ তিনশত মে.টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ বোয়ালমারীতে ১০ ভিক্ষুক পেলেন ১০ ছাগল সরকার আমকে বিশ্ববাজারে নিতে কাজ করছে
৬৬

পদ্মার পাড়ে উন্নত অর্থনীতির হাতছানি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০২২  

অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২৫ জুন বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। এই সেতু বাস্তবায়নে প্রথম ধাক্কাটি ছিল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে দাতা সংস্থার নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়া। 

ষড়যন্ত্রকারীরা ভেবেছিল বাংলাদেশ সরকার এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারবে না। সব ষড়যন্ত্র তুড়ি মেরে এক অসীম সাহসী নেতৃত্ব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে হবে। যেমন ঘোষণা তেমনই কাজ। শুরু করেন এক অসাধ্য সাধন; যা আজ স্বপ্ন নয়; বাস্তবতা হয়ে ধরা দিয়েছে। 

যেখানে আমরা দাতা সংস্থার সাহায্য ছাড়া এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কথাও ভাবতে পারতাম না, সেখানে নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু; যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ইতিহাসের একটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। 

দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরটিতে থাকবে একটি একক রেলপথ। ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যানের সাহায্যে পদ্মার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে ৬.১৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৮.১০ মিটার প্রস্থের পদ্মা সেতু। সেতু দৃশ্যমান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই পাড়ের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠছে। আর সেতু পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হলে সারাদেশের গড় অর্থনীতিতে এ সেতু এক বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হবে। 


এ পথে বিভিন্ন স্থানে যে পরিবর্তন হতে হয়েছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। অনেকবার এ পথ দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে এটিও কি বাংলাদেশ? একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ফরিদপুরের ভাঙ্গা মোড়। বেশ ক'বছর আগে যখন পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়নি, তখন ভাঙ্গা মোড় হয়ে অনেকবার নড়াইল গিয়েছি। একটি গ্রামীণ জনপদ যেমন হয়, তেমনটাই ছিল এ পয়েন্টটি। এখন ভাঙ্গা মোড়কে আর চেনার উপায় নেই। এই ভাঙ্গা মোড়কে কেন্দ্র করে এক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়েছে। আনুমানিক প্রায় ঢাকার হাতিরঝিলের অর্ধেক পরিমাণ জায়গা নিয়ে এই মোড়টি গড়ে উঠছে। না চেনা থাকলে কোন রাস্তা কোন পথে গেছে যে কেউ ভুল করে বসতে পারেন। এই রুটের সুপ্রশস্ত চার লেনের রাস্তাগুলো এখন এমনই হয়েছে যে, দশ বছর আগে কেউ এ পথ দিয়ে গিয়ে থাকলে এখন চিনতেই পারবেন না।
 
যোগাযোগ ব্যবস্থা যে একটি এলাকার আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে, পদ্মার দুই পাড় তার প্রকৃষ্ট উদহারণ। দশ বছর আগেও এ এলাকার মানুষ কল্পনাও করতে পারেননি এখানে ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে? পদ্মার দুই পাড়ে যে কর্মযজ্ঞ চলছে তাকে কেন্দ্র করে বদলে যাচ্ছে পদ্মা পাড়ের মানুষের জীবনচিত্র। পদ্মা পাড়ের বাসিন্দাদের যে জমি এক সময় দুর্গম চর ছিল; নামমাত্র মূল্যে যে জমির মালিকানা বদল হতো সেই জমিই এখন যেন সোনার খনি।

একসময় পদ্মাপাড়ের বেশিরভাগ মানুষ মাছ শিকার কিংবা পদ্মার চরে ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। খরস্রোতা পদ্মার মতিগতি বুঝে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যে মানুষকে বাঁচতে হতো, এখন সেই মানুষকে পদ্মা নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ক্ষেত-খামারের কাজ আর মৎস্য শিকার করা মানুষ উন্নত জীবনের আশায় ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধছেন।

পদ্মা পাড়ের মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা থেকে বিভিন্ন আবাসন কোম্পানি ইতোমধ্যে ব্যবসার এক অমিত সম্ভাবনাময় এলাকা মনে করে ওই এলাকায় হাজির হয়েছে। কেরানীগঞ্জ থেকে সেতুর কাছাকাছি পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে আবাসন কোম্পানিগুলোর সুদৃশ্য সাইনবোর্ড সে কথায় জানান দিচ্ছে। আর শিল্প প্লটের কথা যদি বলি একদিকে সেই সীমান্ত জেলা যশোর, অন্যদিকে সমুদ্র জেলা পটুয়াখালী, বরিশাল কিংবা খুলনা থেকে শুরু করে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলো যেন কে কার থেকে বেশি জায়গায় নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেবে রীতিমতো সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। পদ্মা সেতুকে ঘিরে এর দুই পাড়ে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাংহাই নগরের আদলে শহর গড়ে তোলার বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে পদ্মা পাড়ে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে তোলার মতো বিষয়। 

এই সেতুর ভূমিকা যে কত বড় নিন্দুকেরা এখনও হয়তো অনুধাবন করতে পারছেন কিনা সন্দেহ। সেতুটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা-বরিশাল বিভাগের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিল্প বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখবে। প্রকল্পটির ফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার বা বাংলাদেশের মোট এলাকার ২৯ শতাংশ অঞ্চলজুড়ে সাড়ে ৩ কোটিরও অধিক জনগণ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে। ফলে প্রকল্পটি দেশের পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে সুফলগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এই সেতুটি পুরোপুরি চালু হলে দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। ওই অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষি ও শিল্প পণ্য দ্রুত গতিতে পৌঁছে যাবে ঢাকায়। মোংলা সমুদ্রবন্দর, বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দর, রাজধানী ঢাকা এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। কোনো কোনো স্থান থেকে ঢাকায় যাতায়াতে এখন যে সময় লাগে তা থেকে প্রায় অর্ধেক সময় লাগবে। আবার কোনো স্থান থেকে কয়েক ঘণ্টা কম সময় লাগবে। এতে করে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পদ্মা পাড়কে কেন্দ্র করে পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে। যার কারণে দুই পাড়ে অনেক আধুনিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। সব মিলিয়ে ২০৪১ সালের যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি তার পেছনে পদ্মা সেতু এক বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

তবে এত স্বপ্নের মাঝেও কুচক্রী আর ষড়যন্ত্রকারী মহল ঘাপটি মেরে আছে। এই মহলটি যাতে আমাদের উন্নয়নের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন যাতে না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোথায় শিল্পায়ন হবে, কোথায় নগরায়ণ হবে আবার কোথায় বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকবে এই সবকিছু যদি একটি মাস্টারপ্ল্যান মাফিক হয় তাহলে আমরা সত্যিকারের সুফল পাব। আবার যে নদীকে কেন্দ্র করে এত কর্মযজ্ঞ সেই নদীটিও যেন অক্ষত থাকে। কারণ এ দেশে অতীতে উন্নয়নের নামে নানা ধরনের অনাচার করা হয়েছে। নদী ধ্বংস হয়েছে, পরিবেশ নষ্ট হয়েছে, প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ভারসাম্য হারিয়েছে। একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে পদ্মা পাড়ের অর্থনীতি আমাদের সত্যিকারের জীবন মানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিয়ে আসবে- আমরা সেটিই প্রত্যাশা করি।

 ফরিদপুর প্রতিদিন
 ফরিদপুর প্রতিদিন
এই বিভাগের আরো খবর